অর্থনৈতিক উন্নয়নের পূর্বশর্তগুলো আলোচনা কর।

admin

ভূমিকা :

বিশ্বায়নের এ যুগে অর্থনৈতিক  উন্নয়ন ছাড়া কোন জাতির মুক্তি কল্পনা করা অসম্ভব। তীব্র প্রতিযোগিতার এ যুগে নিজের অস্তিত্বকে টিকিয়ে রাখতে হলে অর্থনৈতিক উন্নয়নের কোন বিকল্প নেই। অর্থনৈতিক উন্নয়নের মাধ্যমে অনুন্নত বা উন্নয়নশীল দেশ তার সকল আর্থসামাজিক সমস্যা মোকাবিলা করতে সক্ষম। কোন দেশের অপরাপর সমস্যাগুলো অর্থনৈতিক উন্নয়নের সাথে প্রত্যক্ষভাবে সম্পর্কিত এবং চক্রাকারে আবদ্ধ। প্রকৃত উন্নয়ন হলে মাথাপিছু আয় বাড়ে শিক্ষার প্রসার ঘটে, জীবনযাত্রার মানোন্নয়ন হয়, সাথে সাথে সামাজিক সংকীর্ণ দৃষ্টিভঙ্গি, কুসংস্কার দূরীভূত হয়। তাই অর্থনৈতিক উন্নয়নের পূর্বশর্তগুলো পূরণের মাধ্যমে দ্রুত অর্থনৈতিক উন্নয়ন যে কোন দেশের জন্য কাম্য।


অর্থনৈতিক উন্নয়নের পূর্বশর্তগুলো আলোচনা কর।


অর্থনৈতিক উন্নয়নের পূর্বশর্ত :

নিম্নে অর্থনৈতিক উন্নয়নের অন্যতম পূর্বশর্তগুলো আলোচনা করা হল :


১. প্রাকৃতিক সম্পদ : দেশের অর্থনেতিক উন্নয়নে প্রাকৃতিক সম্পদের ভূমিকা অপরিসীম। যে কোন প্রকার উৎপাদনে প্রাকৃতিক সম্পদ ব্যবহার অপরিহার্য। প্রাকৃতিক সম্পদের প্রাচুর্যতার উপর নির্ভর করে বিভিন্ন শিল্প কলকারখানা গড়ে ওঠে। যে দেশে প্রাকৃতিক সম্পদ যত বেশি, সে দেশে অর্থনৈতিক উন্নয়নের গতি তত দ্রুত।


২. মানবসম্পদ : বর্তমান উন্নয়ন অর্থনীতির মূলকথা হচ্ছে মানব উন্নয়ন। মানব উন্নয়ন সাধিত হলেই প্রকৃত উন্নয়ন সংঘটিত হয়। প্রকৃত মানব উন্নয়ন ঘটলে শ্রমের উৎপাদন ক্ষমতা বৃদ্ধি। পেয়ে প্রাকৃতিক সম্পদের যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিত হয় এবং উৎপাদন বৃদ্ধি পায়। এতে করে উন্নয়ন প্রক্রিয়া দ্রুত বেগে অগ্রসর হতে থাকে।


অর্থনীতি সম্পর্কে অধ্যাপক আলফ্রেড মার্শালের ধারণাটি উল্লেখ কর।


৩. মূলধন গঠন : উৎপাদনের অন্যতম প্রধান উপকরণ হচ্ছে মূলধন। মূলধন ছাড়া উৎপাদন প্রক্রিয়া যেমন সম্ভব নয়, তেমনি উৎপাদন ছাড়া অর্থনৈতিক উন্নয়ন অকল্পনীয়। মূলধন গঠন নির্ভর করে মানুষের সঞ্চয় প্রবণতার উপর। সঞ্চয় বেশি হলে দ্রুত মূলধন গঠিত হয়ে অর্থনৈতিক উন্নয়নকে ত্বরান্বিত করে। সে লক্ষ্যে কোন দেশের জাতীয় আয়ের ১৫ থেকে ২০ ভাগ মূলধন গঠনে নিয়োগ করা উচিত।


৪. দক্ষ উদ্যোক্তা শ্ৰেণী : অর্থনৈতিক উন্নয়নে দক্ষ উদ্যোক্তা শ্রেণীর পয়োজনীয়তা অনস্বীকার্য। প্রতিভাবান ও দক্ষ উদ্যোক্তা শ্রেণী উৎপাদনের নতুন নতুন পন্থা উদ্ভাবন করে উৎপাদন খরচ হ্রাস করতে পারে। এর ফলে চাহিদা বৃদ্ধি পায়। এবং চাহিদা বৃদ্ধি পেলে উৎপাদন এবং জাতীয় আয় বৃদ্ধি পায়। ৫. সামাজিক অর্থনৈতিক অবকাঠামো : অর্থনৈতিক উন্নয়নের অন্যতম পূর্বশর্ত হচ্ছে উন্নত সামাজিক এবং অর্থনৈতিক অবকাঠামো। অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্যে সর্বাগ্রে দেশের উন্নত | যোগাযোগ ও পরিবহণ ব্যবস্থা, রাস্তাঘাট ও বাধ, স্কুল, কলেজ, হাসপাতাল, বিদ্যুৎ ব্যবস্থা প্রভৃতি স্থায়ী মূলধন সৃষ্টি করতে হবে। কোন দেশের সামাজিক এবং অর্থনৈতিক বুনিয়াদ উন্নত না হলে তার দ্রুত অর্থনৈতিক উন্ননে সব নয়।


৬. দক্ষ জনশক্তি: দেশের অর্থনৈতিক অগ্রগতি শুধু প্রাকৃতিক সম্পদের উপর নির্ভর করে না, এর জন্য দক্ষ জনশক্তি অ সমভাবে প্রয়োজন। অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য প্রাকৃতিক সম্পদের বিকাশ সাধনের প্রয়োজন হয়, আর তা একান্তভাবে নির্ভর করে দক্ষ জনশক্তির উপর। দেশের মানুষ যত অদক্ষ হবে, প্রাকৃতিক সম্পদের উন্নতি ততই কম হবে। পক্ষান্তরে, দেশের শ্রমশক্তি সুদক্ষ হলে, অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য দেশের প্রাকৃতিক সম্পদ নিপুণভাবে ব্যবহার করা সম্ভব হবে।


অর্থনীতি পাঠের প্রয়োজনীয়তা আলোচনা কর।


৭. ব্যাপক শিক্ষাবিস্তার : অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য প্রয়োজন হল ব্যাপক শিক্ষাবিস্তার। দেশে ব্যাপকভাবে শিক্ষাবিস্তার না হলে লোকের আন এবং দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তন হবে না। অজ্ঞানতা এবং সংকীর্ণ দৃষ্টিভঙ্গি অর্থনৈতিক উন্নয়নের পথ রুদ্ধ করে। ফলে অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য ব্যাপক শিক্ষাবিস্তার একান্ত অপরিহার্য।


৮. জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণ : অনিয়ন্ত্রিত জনসংখ্যা জাতির জন্য শুধু বোঝাই নয় তা অর্থনৈতিক উন্নয়নেরও প্রতিবন্ধক। অতিরিক্ত জনসংখ্যার কারণে জনগণের শিক্ষা, চিকিৎসা, স্বাস্থ্যকর বাসস্থানের নিশ্চয়তা বিধান করা সম্ভব হয় না। জনগণের জীবনযাত্রার মান নিম্নগামী হয়, যা অর্থনৈতিক উন্নয়নে বাধা প্রদান করে। আবার বিশ্বল জনগোষ্ঠীর খাদ্য এবং অন্যান্য চাহিদা পূরণে জাতীয় আয়ের সিংহভাগ ব্যয় হয়ে যায় ফলে সুষ্ঠুহারে মূলধন গঠিত হয় না। মূলধনের অভাবে বিনিয়োগ কম হয়। ফলে স্বল্প উন্নয়নের মাধ্যমে অর্থনৈতিক উন্নতি তার আপন গতিতে চলতে পারে না। সে কারণে জনসংখ্যা নিয়ণ অর্থনৈতিক উন্নয়নের অন্যতম পূর্বশর্ত।


৯. বিশেষায়ন : শ্রমবিভাগের মাধ্যমে বিশেষায়ন হয় এবং এর ফলে শ্রমের দক্ষতা বৃদ্ধি পায়। বৃহদায়তন উৎপাদনে শ্রমবিভাজন সম্ভবপর হয়। বিশেষায়ন বৃহদায়তন উৎপাদনে ও অর্থনৈতিক উন্নয়নে বিশেষ সহায়ক।


১০. রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা : রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা অর্থনৈতিক উন্নয়নের অন্যতম পূর্বশর্ত। রাজনীতি অস্থিতিশীল হলে দেশী বিদেশী বিনিয়োগের পরিমাণ কমে, ফলে উৎপাদন কমে। ফলশ্রুতিতে অর্থনৈতিক উন্নয়ন বাধাপ্রাপ্ত হয়।


ব্যষ্টিক ও সামষ্টিক অর্থনীতির মধ্যে পার্থক্যসমূহ উল্লেখ কর


১১. জানমালের নিরাপত্তা : জনগণের জানমালের নিরাপত্তা | পরোক্ষভাবে অর্থনৈতিক উন্নয়নের সাথে সম্পর্কযুক্ত। জানমালের নিরাপত্তা থাকলে সঞ্চয়ের হার বৃদ্ধি পায়। ফলে দ্রুতগতিতে মূলধন গঠিত হয়ে অর্থনৈতিক উন্নয়নকে ত্বরান্বিত করে।


১২. প্রতিযোগিতামূলক বাজার : প্রতিযোগিতামূলক বাজার ব্যবস্থা উৎপাদন বাড়িয়ে অর্থনৈতিক উন্নয়নে সহায়তা করে। বাজারে একচেটিয়া আধিপত্য থাকলে উৎপাদন কমিয়ে মূল্য বৃদ্ধির প্রবণতা দেখা যায়, এতে করে চাহিদা কমে। পক্ষান্তরে, বাজার ব্যবস্থা প্রতিযোগিতামূলক হলে উৎপাদন বাড়ে ও দাম কমে, ফলে চাহিদা বৃদ্ধি পায়।


১৩. সামাজিক ও ধর্মীয় প্রথা : সামাজিক ও ধর্মীয় রীতিনীতি অর্থনৈতিক উন্নয়নকে প্রভাবিত করে। আমাদের দেশের যৌথ পরিবার প্রথা এবং হিন্দুদের জাতিভেদ প্রথা অর্থনৈতিক উন্নয়নের পথে বাধার সৃষ্টি করে। অনেক ধর্মীয় বিশ্বাস এবং কুসংস্কার অর্থনৈতিক উন্নয়নের পথ রোধ করে। মানুষ যদি অভিমাত্রায় অদৃষ্টবাদী হয়ে উঠে এবং সবকিছু নিয়তির উপরে ছেড়ে দেয়, তাহলে অর্থনৈতিক উন্নয়ন দারুণভাবে ব্যাহত হয়।


এল রবিন্স অর্থনীতির সংজ্ঞাটি ব্যাখ্যা কর।


১৪. জনগণের দৃষ্টিভঙ্গি : জনগণের দৃষ্টিভঙ্গির উপর অর্থনৈতিক উন্নয়ন নির্ভর করে। মানুষ যদি সংকীর্ণমনা হয়, তবে [ তারা ছোট কাজকে ঘৃণা করে। ফলে উৎপাদন ব্যাহত হয়। আবার জীবন জগৎ সম্পর্কে মানুষের ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি অর্থনৈতিক উন্নয়নে সহায়তা করে।


১৫. কারিগরি কর্মকৌশল : অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য প্রয়োজন উৎপাদনের আধুনিক কলাকৌশল সম্পর্কে সম্মুখ জ্ঞান। আধুনিক কৌশল রপ্ত করতে না পারলে অর্থনৈতিক উন্নয়ন বাধাগ্রস্ত হয়। দেশের প্রাকৃতিক সম্পদের সর্বোত্তম ব্যবহার | নিশ্চিত করা সম্ভবপর হয় না। ইউরোপ আমেরিকার উন্নয়নের [মূলে রয়েছে কারিগরি দক্ষতা। অথচ অডেল প্রাকৃতিক সম্পদ থাকা সত্ত্বেও মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর অর্থনৈতিক উন্নয়ন ব্যাহত হচ্ছে কারিগরি জ্ঞানের অভাবে।


উপসংহার : পরিশেষে বলা যায়, অর্থনৈতিক উন্নয়ন বলতে একটি দেশের সার্বিক উন্নয়নকে নির্দেশ করে। জীবনযাত্রার মান, মাথাপিছু আয়, উৎপাদন বৃদ্ধির সাথে উৎপাদন যন্ত্রের কলাকৌশলের উন্নয়ন নিশ্চিত হয় অর্থনৈতিক উন্নয়নের মাধ্যমে। তবে অর্থনৈতিক উন্নয়ন করতে গেলে কতকগুলো | পূর্বশর্তের উপস্থিতি একান্ত অপরিহার্য। দক্ষ জনগোষ্ঠী, মূলধনের প্রাচুর্যতা, প্রাকৃতিক সম্পদের আধিক্য, উন্নত অবকাঠামো এ সবকিছুই উন্নয়নকে বাধাহীনভাবে সামনে ধাবিত করে। বাংলাদেশ জনাধিক্য ক্ষুদ্র দেশ হিসেবে উন্নয়নের অনেকগুলো শর্তই অনুপস্থিত। আমাদের উচিত উক্ত অবস্থাগুলো পরিবর্তন করে অর্থনৈতিক উন্নয়নের পরিবেশ সৃষ্টি করা।


#buttons=(Ok, Go it!) #days=(20)

Our website uses cookies to enhance your experience. Check Now
Ok, Go it!