পর্যবেক্ষণ পদ্ধতি বলতে কি বুঝ? এ পদ্ধতির বৈশিষ্ট্য সুবিধা ও অসুবিধাগুলো বর্ণনা - কর।

admin

ভূমিকা :

প্রতিটি বিজ্ঞানই তার বিষয়বস্তু আলোচনা করার জন্য কিছু সুনির্দিষ্ট পদ্ধতি অবলম্বন করে থাকে। বিজ্ঞান হিসেবে মনোবিজ্ঞানও এর ব্যতিক্রম নয়। আচরণ সম্পর্কীয় বিজ্ঞান হিসেবে মানুষ ও অন্যান্য প্রাণীর আচরণের বিভিন্ন দিক সম্বন্ধে উপাত্ত সংগ্রহের জন্য মনোবিজ্ঞান যে কয়টি পদ্ধতি অবলম্বন করে থাকে, তার মধ্যে পর্যবেক্ষণ পদ্ধতি অন্যতম। পর্যবেক্ষণ পদ্ধতি মনোবৈজ্ঞানিক গবেষণার জন্য এক গুরুত্বপূর্ণ পদ্ধতি। বহু পূর্ব থেকেই মনোবিজ্ঞানের গবেষণায় এ পদ্ধতি ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হয়ে আসছে। অর্থাৎ, পরীক্ষণ পদ্ধতির পূর্বে যে পদ্ধতি বহুলাংশে প্রচলিত ছিল তা হল পর্যবেক্ষণ পদ্ধতি। এমন কতকগুলো আচরণ বা ঘটনা আছে যা গবেষণাগারে তৈরি করা যায় না। সেসব আচরণ বা ঘটনা সম্পর্কে অনুসন্ধান করতে পর্যবেক্ষণ পদ্ধতি ব্যবহৃত হয়ে থাকে।

পর্যবেক্ষণ পদ্ধতি বলতে কি বুঝ? এ পদ্ধতির বৈশিষ্ট্য সুবিধা ও অসুবিধাগুলো বর্ণনা -  কর।

পর্যবেক্ষণ পদ্ধতি :

কোন ঘটনাকে মনোযোগ সহকারে প্রত্যক্ষ করে সে সম্পর্কে জ্ঞান লাভ করার পদ্ধতিকে পর্যবেক্ষণ পদ্ধতি বলে। আমরা আমাদের মানসিক অবস্থা সম্পর্কে সচেতন অর্থাৎ, নিজেরা নিজেদের মানসিক অবস্থার খবর রাখি। কিন্তু অন্যের মনের খবর আমরা তার বাহ্য আচরণ পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে জানতে পারি। যেমন-কোন ছেলের হাসি আর হাত তালি দেখে বুঝি সে আনন্দিত, কারও অশ্রুসজল চোখ দেখে বুঝি সে দুঃখিত, আবার কারও চিৎকার ও টেবিল চাপড়ানো দেখে বুঝি সে রাগান্বিত।


পর্যবেক্ষণ পদ্ধতির বৈশিষ্ট্য : পর্যবেক্ষণের সংজ্ঞা বিশ্লেষণ করার পর এর কতকগুলো বৈশিষ্ট্য লক্ষ্য করা যায়। নিম্নে বৈশিষ্ট্যগুলো আলোচনা করা হল :

১. পর্যবেক্ষণ হল কোন বিষয়ের নিয়মতান্ত্রিক প্রত্যক্ষ করা।

২. প্রত্যক্ষ করার ব্যাপারটি অনেক সময় নিরীক্ষণ, পরীক্ষণ বা পরিমাপণের চরিত্র লাভ করতে পারে।

৩. পর্যবেক্ষণের ক্ষেত্রে যে বিষয়টি প্রত্যক্ষ করা হয় সে সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহ ও রেকর্ড করার বিষয় অন্তর্ভুক্ত করতে পারে।

৪. পর্যবেক্ষণ উদ্দেশ্যমূলক তবে কিছু পর্যবেক্ষণ গবেষক অবচেতনভাবে করে থাকে। কিন্তু বিজ্ঞানভিত্তিক পর্যবেক্ষণের ক্ষেত্রে উদ্দেশ্যমূলক হওয়া অপরিহার্য।

এ পদ্ধতির মাধ্যমে মানব আচরণের তাৎক্ষণিক রূপ রেকর্ড করা যায় ।

৬. অশিক্ষিত ও অক্ষরজ্ঞানহীন মানুষের কাছ থেকে তথ্য সংগ্রহ করা সহজ হয়।

৭. শিশু বা প্রাণী হলে সেখানে গবেষকের পর্যবেক্ষণ ছাড়া অন্যকোন পথ থাকে না ।

৮. এটি ইন্দ্রিয়জাত অভিজ্ঞতার উপর নির্ভর করে।

৯. পর্যবেক্ষণের ক্ষেত্রে ছবি, সংবাদপত্র, পূর্বের গবেষণা, ডাইরি ইত্যাদি গুরুত্বপূর্ণ।

১০. অনেক আচরণ ও অভ্যাস আছে যা সরাসরি বর্ণনা দেওয়া কঠিন। এ আচরণকে পর্যবেক্ষণের সাহায্যে সরাসরি প্রত্যক্ষ করা যায়।

১১. পর্যবেক্ষণ মৌলিক উপাত্ত সৃষ্টির সাহায্যে পরীক্ষণমূলক গবেষণাকে সাহায্য করতে পারে।

১২. ধারণকৃত ঘটনাকে যথাযথ সম্পাদনার মাধ্যমে সাংকেতিককরণ করা হয়।

১৩. জরিপ বা অন্যান্য পদ্ধতি প্রয়োগের ক্ষেত্রে পর্যবেক্ষণ পদ্ধতি পূর্ব অভীক্ষণের ভূমিকা পালন করে।


পর্যবেক্ষণ পদ্ধতির সুবিধা :

পর্যবেক্ষণ পদ্ধতি মনোবিজ্ঞানে ব্যবহৃত একটি বহুল প্রচলিত পদ্ধতি বলে এর বিশেষ কিছু সুবিধা রয়েছে, যা অন্যান্য পদ্ধতিতে নেই। এ পদ্ধতির সুবিধাসমূহ নিম্নরূপ।


১. অপরের মানসিক অবস্থা জানা যায়:

একমাত্র পর্যবেক্ষণের সহায়তায় আমরা অপরের মানসিক অবস্থা ও প্রতিক্রিয়া সম্পর্কে জানতে পারি। অন্তদর্শন কেবলমাত্র নিজের মনকে প্রত্যক্ষভাবে জানার সুযোগ করে দেয়। অপর ব্যক্তির মনকে সোজাসুজি প্রত্যক্ষ করার জন্য পর্যবেক্ষণ পদ্ধতি ব্যবহার করা হয়। অপরের মনকে না জানতে পারলে মন সম্পর্কীয় সঠিক নিয়ম আবিষ্কার ও ব্যাখ্যা করা সম্ভব নয়। এজন্য পর্যবেক্ষণ অবশ্যই প্রয়োজনীয়।


২. স্বাভাবিক পরিবেশে পর্যবেক্ষণ :

নির্ধারিত ঘটনা বা আচরণকে স্বাভাবিক পরিবেশে যখন ঘটনাটি ঘটছে, তখন পর্যবেক্ষণ করা যায়। পর্যবেক্ষণকালে যা কিছু ঘটছে, আমরা কেবলমাত্র সেসব বিষয় বা আচরণই অনুধ্যান করতে পারি।


৩. অকৃত্রিম আচরণ :

পর্যবেক্ষণ পদ্ধতির সাহায্যে মানুষ ও প্রাণীর অকৃত্রিম আচরণকে জানা যায়। কিন্তু পরীক্ষণ পদ্ধতিতে মানুষ বা প্রাণীর আচরণ কৃত্রিম উপায়ে বিজ্ঞানী সৃষ্টি করেন।


৪. সকল আচরণ সম্পর্কে জ্ঞান লাভ :

প্রায় সব ধরনের আচরণই এ পদ্ধতির আয়ত্তাধীন। এজন্য এ পদ্ধতির সাহায্যে সকল আচরণ সম্পর্কে ধারণা অর্জন করা যায়।


৫. সমাজ মন সম্পর্কে জ্ঞান লাভ :

পর্যবেক্ষণের সাহায্যে আমরা সমাজ মন সম্পর্কে জ্ঞান লাভ করে থাকি। বিভিন্ন জাতির আচারব্যবহার, রীতিনীতি, বিধিনিষেধ, সংঘ জীবন ইত্যাদি পর্যবেক্ষণ করে সমাজ ও মনের ক্রিয়া প্রণালী জানতে পারি। এক্ষেত্রে পর্যবেক্ষণ পদ্ধতির ভূমিকা খুবই গুরুত্বপূর্ণ।


৬. পরীক্ষণ পদ্ধতির সহায়ক :

পর্যবেক্ষণ পদ্ধতির সবচেয়ে বড় সুবিধা হল এ যে, এটা পরিক্ষণ পদ্ধতির সহায়ক হিসেবে কাজ করতে পারে। পরীক্ষালব্ধ জ্ঞান বাস্তবে কার্যকর কি না তা পর্যবেক্ষণ পদ্ধতির সাহায্যে জানতে পারি 1


৭. নকশার প্রয়োজন হয় না :

এ পদ্ধতির জন্য বিশেষ গাণিতিক দক্ষতা বা জটিল নকশা প্রণয়নের প্রয়োজন হয় না।


৮. প্রাণীর স্বাভাবিক আচরণ সম্পর্কে ধারণা :

পর্যবেক্ষণ পদ্ধতির একটি বড় বৈশিষ্ট্য হল প্রাণীর আচরণের স্বাভাবিক প্রকৃতি সম্পর্কে জানা এ পদ্ধতির মাধ্যমে সহজতর হয়।


৯. শিশু ও প্রাণী মনের ক্ষেত্রে নির্ভরযোগ্য :

যেসব ক্ষেত্রে অর্ন্তদর্শন পদ্ধতির প্রয়োগ সম্ভব নয়। যেমন- শিশু মন, প্রাণী মন, অস্বাভাবিক মন ইত্যাদি সেসব ক্ষেত্রে জ্ঞান লাভ করার জন্য পর্যবেক্ষণ পদ্ধতিই সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য পদ্ধতি |


১০. মনের বাহ্য অংশের জ্ঞান লাভ :

মনের অভ্যন্তরীণ অংশের জ্ঞান অর্ন্তদর্শনের সাহায্যে লাভ করা গেলেও মনের বহিঃপ্রকাশের অর্থাৎ, বাহ্য অংশের জ্ঞান লাভ করার পক্ষে পর্যবেক্ষণই অবলম্বনীয় পদ্ধতি, কেবলমাত্র অর্ন্তদর্শনের সহায়তা পাওয়া মনের অভ্যন্তরীণ অংশের জ্ঞান মনের সম্পূর্ণ জ্ঞান নয়, সম্পূর্ণ জ্ঞান অর্জন করতে হলে পর্যবেক্ষণের সাহায্য গ্রহণ করতে হয় ।


পর্যবেক্ষণ পদ্ধতির অসুবিধা : নিম্নে এ পদ্ধতিগুলো আলোচনা করা হল :


১. ব্যক্তিনিষ্ঠ ফলাফল :

পর্যবেক্ষণ পদ্ধতিতে প্রাপ্ত ফলাফল অনেকটা ব্যক্তিনিষ্ঠ হয়ে থাকে। ব্যক্তিগত সংস্কার, পূর্ব ধারণা এবং পক্ষপাত প্রবণতা অপর ব্যক্তির আচরণ পর্যবেক্ষণ করে তার মানসিক অবস্থা অনুমানের ও যথাযথ ব্যাখ্যার পথে অন্তরায় হতে পারে।


২. প্রাপ্ত তথ্য ভ্রান্ত হতে পারে :

পর্যবেক্ষণলব্ধ মানসিক প্রক্রিয়ার জ্ঞান ভ্রান্ত হতে পারে। বাহ্যিক আচরণ বা দেহগত বহিঃপ্রকাশ লক্ষ্য করে অপর ব্যক্তির মন সম্পর্কে অনুমান করার সময় আমরা নিজেদের ভাবনা, চিন্তা এবং অনুভূতি অপরের মনে আরোপ করতে পারি। তার ফলে সে অনুমান ভ্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা থাকে।


৩. কৃত্রিম আচরণ প্রদর্শনকারীর ক্ষেত্রে অপ্রযোজ্য :

কপট বা কৃত্রিম আচরণ প্রদর্শনকারী ব্যক্তির ক্ষেত্রে এ পদ্ধতির প্রয়োগ তেমন কার্যকরী হয় না। কারণ ভণ্ডের ভণ্ডামী বা কপট ব্যক্তির বাহ্য আচরণ বা দেহগত বহিঃপ্রকাশ লক্ষ্য করে মনের খবর সঠিক অনুমান করা খুবই কঠিন


৪. আচরণ বুঝা কষ্টকর :

যে আচরণ পর্যবেক্ষণের বিষয়বস্তু সে আচরণ সুনির্দিষ্ট ও সহজবোধ্য নয়। বিভিন্ন মানসিক প্রক্রিয়ার বাহ্যপ্রকাশ একই রকম হতে পারে। কেউ আনন্দে অশ্রুপাত করে, আবার কেউ দুঃখে অশ্রুপাত করে। কোনটা আনন্দের হাসি আর কোনটা বিদ্রুপের হাসি সেটা বুঝে নেওয়া অনেক সময় খুবই কঠিন।


৫. মানসিক প্রক্রিয়ার ভিন্ন ভিন্ন বাহ্যপ্রকাশ :

অনেক সময় একই মানসিক প্রক্রিয়ার বাহ্যপ্রকাশ ভিন্ন ভিন্ন হতে পারে, যার জন্য বাহ্যপ্রকাশ বা বাহ্য আচরণ পর্যবেক্ষণ করে তার অর্ন্তনির্হিত মানস প্রক্রিয়ার সঠিক জ্ঞান লাভ করা সবসময় সম্ভব হয় না। অনেক সময় দুঃখ মানুষকে অস্থির ও চঞ্চল করে তোলে, আবার অনেক সময় স্থির ও শান্ত করে তোলে।


৬. বহিঃপ্রকাশ থেকে গভীরতার জ্ঞান লাভ করা কঠিন :

মনের বহিঃপ্রকাশ পর্যবেক্ষণ করে মনের গভীরতার স্তরের সঠিক জ্ঞান লাভ করা সম্ভব নয়। আবার মনের নিজ্ঞান স্তরের বহিঃপ্রকাশ পর্যবেক্ষণ করে নিজ্ঞান স্তর সম্পর্কে জ্ঞান লাভ করা সম্ভব নয়। কারণ নিজ্ঞান মনের বহিঃপ্রকাশ অনেক ক্ষেত্রে অস্বভাবী।


৭. প্রয়োজনীয় ঘটনার জন্য অপেক্ষা :

ইচ্ছা করলেই যখন তখন ঘটনার সৃষ্টি বা পর্যবেক্ষণ করা যায় না। পর্যবেক্ষককে কোন ঘটনার জন্য অপেক্ষা করতে হয়।


৮. তথ্যের যথার্থতা প্রমাণ কঠিন :

এ পদ্ধতির একটি বড় দোষ হল, প্রাপ্ত তথ্যের যথার্থতা যাচাই করা খুব কঠিন ব্যাপার। পর্যবেক্ষণ সহজে পুনরাবৃত্তি করা যায় না।


৯. চলের নিয়ন্ত্রণ না থাকা :

এ পদ্ধতিতে চলসমূহের তেমন কোন নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা নেই।


উপসংহার :

পরিশেষে বলা যায় যে, পর্যবেক্ষণ পদ্ধতি ব্যবহারে বেশ কিছু অসুবিধা থাকলেও সামাজিক গবেষণায় এ পদ্ধতির ব্যাপক ব্যবহার রয়েছে। যেসব ক্ষেত্রে গবেষণাগারের কৃত্রিম পরিবেশে তথ্যানুসন্ধান সম্ভব হয় না। যেখানে স্বাভাবিক পরিবেশ বজায় রাখা দরকার। পর্যবেক্ষণ পদ্ধতি সেখানে একটি নির্ভরযোগ্য পদ্ধতি, তাই পর্যবেক্ষণ পদ্ধতির ক্ষেত্র অনেক ব্যাপক।



#buttons=(Ok, Go it!) #days=(20)

Our website uses cookies to enhance your experience. Check Now
Ok, Go it!