দর্শন শাস্ত্রে গ্রিকদের অবদান আলোচনা কর।

admin


ভূমিকা : গ্রিক দর্শনের বিকাশের মধ্য দিয়ে যে যুক্তিনির্ভর বুদ্ধিবৃত্তির বিকাশ ঘটেছিল তা গ্রিক দর্শনের ক্ষেত্রে অবিস্মরণীয় ভূমিকা রাখে। টায়রান্টদের যুগ (৬৫০-৫০০খ্রিস্টপূর্ব) থেকে শুরু করে এথেন্সে গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র ব্যবস্থায় প্রবর্তন পর্যন্ত যে মুক্ত চিন্তার পরিবেশ তৈরি হয়েছিল তার পথ ধরে গ্রিক বিজ্ঞানীগণ বিশ্বের বিভিন্ন বিষয় ও মানুষের জীবন সম্পর্কে গবেষণা করার সুযোগ লাভ করে। মানবসভ্যতার ইতিহাসে যে কয়টি প্রাচীন সভ্যতা আধুনিক বিশ্বের জ্ঞান-বিজ্ঞান, সাহিত্য ও দর্শনের উৎকর্ষতায় অসামান্য অবদান রেখে গেছে, তার মধ্যে প্রাচীন গ্রীক সভ্যতার অবদান অনস্বীকার্য ।


দর্শন শাস্ত্রে গ্রিকদের অবদান আলোচনা কর।


গ্রিক সভ্যতার দর্শন : গ্রিক সভ্যতার দর্শনকে সাধারণত দুটি পর্যায়ে আলোচনা করা যেতে পারে। যথা- 


(ক) হেলেনীয় যুগের দর্শন ও

(খ) হেলেসেস্টিক যুগের দর্শন।

 

(ক) হেলেনিক যুগের দর্শন : হেলেনীয় যুগের দর্শনকে যারা প্রভাবিত ও পরিমার্জিত করে একটি সুন্দর দর্শনের সমাবেশ ঘটিয়েছেন সেই সব দার্শনিকদের সম্পর্কে নিম্নে আলোচনা করা হলো -


১. থেলিস : হেলেনায় যুগে দর্শন সম্পর্কে বড় অবদান রয়েছে দার্শনিক থেলিসের। তিনি ৫৮৫ খ্রিস্টপূর্বাব্দে সর্ব প্রথম সূর্য গ্রহণের সময় নিরূপণ করতে পেরেছিলেন এর মাধ্যমে তিনি প্রমাণ করতে পেরেছিলেন যে, প্রাকৃতিক নিয়মানুসারেই সূর্য গ্রহণ হয়ে থাকে।


২. পিথাগোরাস : খ্রিস্টপূর্ব ষষ্ঠ শতকে পিথাগোরাস বিশ্ব বিশ্রুত গণিততত্ত্ব হিসেবে পরিচিত ছিলেন। জ্যামিতির উন্নয়নে তিনি অসাধারণ পাণ্ডিত্য দেখাতে পেরেছিলেন। তিনি গাণিতিক ভাবে প্রমাণ করতে পেরেছিলেন যে পৃথিবী বৃত্তাকার।


৩. এনাক্সোগোরাস : গ্রিক দর্শনে ও বিজ্ঞানে অন্যতম অবদান ছিল বিজ্ঞানী এনাক্সোগোরাসের। তিনিই প্রথম ধারণা দেন যে সূর্য হচ্ছে উত্তপ্ত ও পাথরের পিন্ড এবং চন্দ্র সূর্যের আলোকে আলোকিত হয়। তার ধারণা ছিল যে চাঁদে জীবিত প্রাণী থাকায় যথেষ্ট সম্ভাবনা রয়েছে।


৪. হিপোক্রাটস : গ্রিক দর্শনে হিপোক্রাটস ছিল মূলত একজন চিকিৎসাবিজ্ঞানী। হিপোক্রাটস শরীরবিদ্যার উপর গবেষণা করে রোগের প্রকৃতি নির্ণয় করতে সক্ষম হয়েছিলেন।


৫. হিরাক্লিটাস : পরিবর্তন বাদের প্রবক্তা হিরাক্লিটাস বলেন পরিবর্তনই একমাত্র চিরন্তন সত্য, জগতে চিরস্থায়ী বলে কিছু নেই তার বিখ্যাত উক্তি “একই নদীতে দুই বার অবগাহন করা যায় না।” অর্থাৎ নদীর ধারা ও পরিবর্তনশীল। তাঁর মতে, সবকিছুই পরিবর্তন হয় কিন্তু পরিবর্তন নীতির কোনো পরিবর্তন হয় না।


৬. ডেমোক্রিটাস : গ্রিসের ইতিহাসে ডেমোক্রিটাস ছিলেন একজন উল্লেখযোগ্য দার্শনিক ও বৈজ্ঞানিক। তিনি মনে করেন বিশ্বব্রহ্মাণ্ড তৈরি হয়েছে এটম দিয়ে, যা দেখা যায় না এবং এই এটম হচ্ছে সবসময় গতিশীল ।


৭. সোফিস্ট : মানুষ ও পৃথিবীর উৎস এবং বিকাশ সম্পর্কিত চিন্তার ক্ষেত্রে প্রাচীন গ্রিসে একশ্রেণির যুক্তিবাদী দার্শনিকের উদ্ভব ঘটে। এরা সোফিস্ট নামে পরিচিত। তাঁদের মতে, দার্শনিকদের যে কোনো বক্তব্যই চূড়ান্ত এবং চিরসত্য নয়। সোফিস্ট চিন্তা নায়করা ছিলেন গ্রিসের যুক্তিবাদের শিক্ষক। তাঁরা বর্ণিত বক্তব্য প্রমাণ করতে বলেন।


৮. সক্রেটিস : সর্বযুগের শ্রেষ্ঠ চিন্তানায়কদের মধ্যে অন্যতম পুরোধা সক্রেটিসের সময়কালে গ্রিক নগররাষ্ট্র বড় ধরনের পরিবর্তন ঘটেছিল। গ্রিক দার্শনিকদের চিন্তার মূল বিষয় আদর্শ রাষ্ট্র ও সৎ নাগরিক। এদিক থেকে সক্রেটিস গ্রিক দার্শনিকদের মধ্যে সবচেয়ে খ্যাতিমান ও নির্ভীক ছিলেন। তার চিন্তার মূল কথা ছিল মানুষের বুদ্ধিবৃত্তি দিয়ে প্রত্যেকটি বস্তুই যাচাই করে নিতে হতো।


৯. প্লেটো : সক্রেটিসের সুযোগ্য ছাত্র ছিলেন প্লেটো এবং তিনি এরিস্টটলের গুরুও ছিলেন। তিনি বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে সরকার ব্যবস্থার বিন্যাস সম্পর্কে শিক্ষা দিতে। তার এ ক্ষেত্রে বিখ্যাত গ্রন্থ হচ্ছে The Republic । এতে তিনি সরকার বিভিন্ন রূপ, যেমন, রাজতন্ত্র, প্রজাতন্ত্র, অভিজাততন্ত্র, ইত্যাদি অন্তর্ভুক্ত ছিল। তাই বলা যায় গ্রিক দর্শনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিলেন।


(খ) হেলেনিস্টিক যুগের দর্শন : হেলেনিস্টিক যুগের দার্শনিকদের দর্শন সম্পর্কে নিম্নে বর্ণনা করা হল -


১. এরিস্টেটল : এরিস্টেটল ছিলেন গ্রিক দার্শনিক প্লেটোর ছাত্র ও আলেকজান্ডারের গুরু। এরিস্টটলকে রাষ্ট্র বিজ্ঞানের জনক বলা হয় । তিনি শরীর বিদ্যা উদ্ভিদবিদ্যা ও প্রাণীবিদ্যার বিশেষ ব্যুৎপত্তি অর্জন করেন।


২. হিপার্কাস : গ্রিক দর্শনে হিপার্কাসের নাম বিশেষ ভাবে উল্লেখযোগ্য। তিনি ছিলেন একজন জ্যোতির্বিদ। তিনি পৃথিবী থেকে চাঁদের দূরত্ব এবং চাঁদের প্রায় সঠিক ব্যাস নির্ণয় করতে সক্ষম হয়েছিলেন।


৩. জেনো : জেনো ছিলেন একজন সেমেটিক দার্শনিক। তিনি স্টোরিক মতবাদের স্কুল গড়ে তুলেছিলেন। তার মতে এই বিশ্ব জগ মূলত সামঞ্জস্যপূর্ণ, তবে মাঝে মাঝে এতে যে অসঙ্গতি দেখা দেয় তার সমাধানের মধ্য দিয়েই পরম মঙ্গল লাভ করা যায়।


৪. এপিকিউরাস : এপিকিউরাস ছিলেন এপিকিউরাসদের প্রবক্তা। তাঁর মতে চূড়ান্ত মঙ্গল লাভ করা যায় আনন্দ লাভের মধ্য দিয়ে। কিন্তু ইন্দ্রীয়পরায়ণতা ও লাম্পট্য এপিকিউরাসের মতে আনন্দ নয়, ক্ষুধা-তৃষ্ণা মেটানো একটি স্বাভাবিক মঙ্গলজনক কর্ম হলেও তার মতে মানসিক ও সৎ চিন্তার আনন্দই প্রকৃত আনন্দ ।


উপসংহার : পরিশেষে বলা যায় যে, গ্রিক দর্শনের ক্ষেত্রে পৃথিবীর ইতিহাসে গ্রিক দার্শনিকদের গুরুত্ব অপরিসীম। কারণ গ্রিসকে বলা হয় দার্শনিকদের একটি মিলনক্ষেত্র দার্শনিকগণ দর্শন ক্ষেত্রে বহুবিদ পাণ্ডিত্য দেখাতে সক্ষম হয়েছিলেন।


#buttons=(Ok, Go it!) #days=(20)

Our website uses cookies to enhance your experience. Check Now
Ok, Go it!