রাজনৈতিক অংশগ্রহণ কী? মানুষ রাজনীতিতে অংশগ্রহণ কারনসমূহ আলোচনা কর।

admin

ভূমিকা :

রাজনৈতিক অংশগ্রহণ হলো এমন একটি প্রক্রিয়া, যার মধ্য দিয়ে জনগণের রাজনীতিতে গ্রহণের সুযোগ হয়। রাজনীতি সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা পায়, রাজনৈতিক পদ্ধতি সম্পর্কে ওয়াকিবহাল হওয়ার মধ্য দিয়ে জেনীতির প্রতি আগ্রহী হয়ে ওঠে। রাজনৈতিক অংশগ্রহণ যে কোন দেশের রাজনৈতিক প্রক্রিয়ায় জনগণের সংশ্লিষ্টতার এর ইঙ্গিত করে। সুতরাং বলা যায় রাজনৈতিক অংশগ্রহণ হলো রাজনৈতিক ব্যবস্থার সিদ্ধান্তগ্রহণ প্রক্রিয়ায় ও নির্ধারণে সমাজের সদস্যদের সংশ্লিষ্টতা নিশ্চিত করা।


রাজনৈতিক অংশগ্রহণ কী? মানুষ  রাজনীতিতে অংশগ্রহণ কারনসমূহ আলোচনা কর।


রাজনৈতিক অংশগ্রহণ কারণ :

রাজনৈতিক অংশগ্রহণ মূলত রাজনৈতিক ব্যবস্থায় জনগণকে সম্পৃক্ত করা এবং এর প্রশাসনে ভূমিকা পালন করার উপর গুরুত্বারোপ করা। রাজনৈতিক অংশগ্রহণ হলো মূলত শ্রেণীতিতে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে জনগণের অংশগ্রহণকে আগ্রহী ও নিশ্চিত করে তোলা।


প্রামাণ্য সংজ্ঞা : রাজনৈতিক অংশগ্রহণ সম্পর্কে বিভিন্ন রাষ্ট্রবিজ্ঞানী ও সমাজবিজ্ঞানী বিভিন্ন সংজ্ঞা দিয়েছেন। কিন্তু তাঁদের কয়েকটি সংজ্ঞা উল্লেখ করা হলো :


স্যামুয়েল পি. হান্টিংটন (Samuel P. Huntington) বলেছেন, “রাজনৈতিক অংশগ্রহণ বলতে এমন কার্যক্রমকে বুঝায় যাতে বেসামরিক লোকজন অংশগ্রহণ করে এবং সরকারের সিদ্ধান্ত প্রণয়নে প্রভাব বিস্তার করে। [By political participation we mean those activities of private citizens designed to influence governmental decision making.]


অধ্যাপক ডেভিড ইস্টোন (Prof. David Easton) বলেছেন, “রাজনৈতিক অংশগ্রহণ হচ্ছে সেসব ক্রিয়াকর্ম যা সরকারি সিদ্ধান্তগ্রহণ প্রক্রিয়া ও সরকারি কার্যাবলিকে প্রভাবিত করে।


হার্বার্ট ম্যাকলুসকি (Herbert Mckloski) বলেছেন, “রাজনৈতিক অংশগ্রহণ বলতে সমাজের সদস্যদের বিশেষ কিছু স্বেচ্ছামূলক কার্যক্রমে অংশগ্রহণ, প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে সরকারি নীতি নির্ধারণ, ভোট দান, রাজনৈতিকভাবে ধর্মঘট, মিটিং মিছিল করা, আইনসভার সদস্য ও অন্যান্য রাজনীতিবিদদের বিদেশের সাথে সংযোগ সাধনকে বুঝায়।”


"The International Encyclopaedia of Social Science' এ উল্লেখ আছে, “রাজনৈতিক অংশগ্রহণ বলতে সেসব স্বতঃস্ফূর্ত কর্মকাণ্ডকে নির্দেশ করে, যার দ্বারা জননীতি প্রণয়নে সমাজের সদস্যবৃন্দ প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে শাসক নির্বাচনে অংশ নেয়।” [Participation is the principal means by which consent is granted or withdrawn in a democracy and rulers are made accountable to the ruled.]


মাইরন ওয়েনার (Myron Weiner) বলেছেন, "রাজনৈতিক অংশগ্রহণে সেসব স্বেচ্ছাপ্রণোদিত কার্যক্রম অন্তর্ভুক্ত বা সরকারি নীতি প্রণয়ন, জনপ্রশাসনের কার্যক্রম পরিচালনা এমনকি জাতীয় বা আঞ্চলিক যে কোন পর্যায়ে রাজনৈতিক নেতৃত্ব নির্ধারণকে প্রভাবিত করে।”


সুতরাং বলা যায়, রাজনৈতিক অংশগ্রহণ হলো রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্ত প্রণয়ন ও নীতি প্রণয়নের ক্ষেত্রে জনগণের অংশগ্রহণ।


রাজনীতিতে মানুষের অংশগ্রহণের কারণ :

রাজনীতিতে জনগণের অংশগ্রহণের পিছনে বিভিন্ন প্রক্রিয়া ইয়াছে। রাজনীতিতে জনগণের অংশগ্রহণ দু'টি প্রক্রিয়া ও উদ্দেশ্যে হয়। তা হলো, Masses বা সাধারণ জনগণের গ্রহণের উদ্দেশ্য থাকে ভিন্ন ও Elites বা এলিট শ্রেণির অংশগ্রহণের উদ্দেশ্যও থাকে ভিন্ন। নিম্নে রাজনীতিতে মানুষের অংশগ্রহণের কারণ সম্পর্কে আলোচনা করা হলো :


১. অর্থনৈতিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা (Ensure economical security) : Economical Security বা নৈতিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য সাধারণ জনগণ রাজনৈতিক প্রক্রিয়ার সাথে সম্পৃক্ত হয়। যেমন- Trade inoverent এর মাধ্যমে শ্রমিকরা তাদের দাবি আদায়ে সোচ্চার হয়। আর Trade union গঠিত হয় বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের ইন্ধনে । তাই বলা যায়, অর্থনৈতিকভাবে সচ্ছলতা অর্জন জনগণের রাজনীতিতে অংশগ্রহণের একটি অন্যতম উদ্দেশ্য।


২. সামাজিক মর্যাদা বৃদ্ধি করা (Increase social status ) : Mass peoples বা সাধারণ জনগণের রাজনৈতিক প্রক্রিয়ায় অংশগ্রহণের পিছনে তাদের সামাজিক মর্যাদা অর্জনের উদ্দেশ্যও নিহিত। রাজনীতিতে অংশগ্রহণের মাধ্যমে তারা Social status কে বৃদ্ধি করতে তৎপর হয়ে ওঠে। যেমন- তৃণমূল পর্যায়ে যখন ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন ও পৌর নির্বাচনে অংশগ্রহণের মাধ্যমে চেয়ারম্যান ও মেম্বার নির্বাচিত হয় তখন তার মর্যাদা ও অবস্থান স্বাভাবিকভাবেই বেড়ে যায়।


৩. বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা বৃদ্ধিকরণ (Increase different opportunity): রাজনৈতিক অংশগ্রহণ প্রক্রিযার অংশগ্রহণের সাথে সাধারণ জনগণের সম্পৃক্ত হওয়ার উদ্দেশ্য হলো বিভিন্ন ধরনের আর্থসামাজিক সুযোগ-সুবিধা ভোগ করা। যেমন - বিরোধী রাজনৈতিক দল দ্বারা অত্যাচারিত হওয়ার সুযোগ প্রতিহত করা। নিজ এলাকা বা মহরায় আধিপত্য বিস্তার করা স্থানীয় পর্যায়ে নেতৃত্ব প্রদানের সুযোগ ভোগ করা।


৪. চাকরি ও আয়ের নিশ্চয়তা বিধান করা (Ensure job and income ) : সাধারণ জনগণের রাজনৈতিক প্রক্রিয়ায় অংশগ্রহণের কারণ হিসেবে বলা যায়, চাকরি ও আয়ের নিশ্চয়তা বিধান করা। যেমন- কোন রাজনৈতিক দর যখন ক্ষমতাসীন থাকে তখন তার দলের অনুসারী কর্মীদেরকে চাকরি দিয়ে থাকে। তাছাড়া চাকরি ছাড়াও ব্যবসায়িক বিভিন্ন সুবিধা প্রদানের মাধ্যমে আয়ের পথ সৃষ্টি করে দেয়। যেমন- ব্যবসায়ী লাইসেন্স পারমিট প্রদান করা।


৫. সম্পদের মালিকানা হস্তগত করা (Capture the ownership of resources) : সম্পদের মালিকানা হস্ত গত করা যদিও অনেকটা অবৈধ উপায়ে হয়ে থাকে। তবুও সেটা রাজনৈতিক অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার জন্য রাজনৈতিক দলগুলো সুযোগ-সুবিধা দিয়ে থাকে। যেমন- বিভিন্ন এলাকার প্রভাবশালী ব্যক্তিরা জোরপূর্বক অন্যের জমি ও সম্পদ দখ করে নেয়। এতে মদদ ও সমর্থন যুগিয়ে থাকে রাজনৈতিক দলগুলো।


৬. রাজনৈতিক ক্ষমতা লাভ (Achievement of political power): এলিট শ্রেণির রাজনৈতিক প্রক্রিয়ার সাথে সম্পৃক্ত হওয়ার মূল উদ্দেশ্য থাকে বিভিন্ন ধরনের ক্ষমতা হস্তগত করা ও সুযোগ-সুবিধা ভোগ করা। তবে মূল লক্ষ্য থাকে রাজনৈতিক ক্ষমতা হস্তগত করে নিজের আধিপত্য বিস্তার, সামাজিক অবস্থান ও মর্যাদা বৃদ্ধি করা।


৭. অভ্যন্তরীণ শান্তিশৃঙ্খলা ও নিরাপত্তা ব্যবস্থার উন্নয়ন (Development of internal peace and order and security system) : এলিট শ্রেণির রাজনৈতিক প্রক্রিয়ায় অংশগ্রহণের উদ্দেশ্য হলো দেশের অভ্যন্তরীণ শৃঙ্খলা ও নিরাপত্তা ব্যবস্থার উন্নয়ন নিশ্চিত করা। এলিট শ্রেণি রাজনৈতিক ক্ষমতা গ্রহণের মাধ্যমে প্রশাসনকেও নিম্ন নিয়ন্ত্রণে নিয়ে আসে। যার ফলে আইনশৃঙ্খলার অবনতি ঘটতে পারে না এবং সামাজিক নিরাপত্তা জোরদার হয়।


৮. সামাজিক ও রাজনৈতিক সংহতি বৃদ্ধি করা (Increase social and political solidarity) : Social and political stability নিশ্চিত করার লক্ষ্যে যে সামাজিক ও রাজনৈতিক সংহতির প্রয়োজন হয় তা বৃদ্ধিকরণের জন্য এটি শ্রেণি রাজনীতিতে অংশগ্রহণ করে থাকে। Elite শ্রেণি কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণের মাধ্যমে সংহতি বিরোধী কোন সিদ্ধান্ত গ্রহণ বা প্রক্রিয়ার উদ্ভব ঘটলে কঠোর হস্তে দমন করে। যেমন- দেশের অভ্যন্তরে অনেক সময় অনেক চাওয়া পাওয়াকে কেন্দ্র করে পরিবেশ উত্তপ্ত হয়ে উঠে, যা National integration এর পথে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে।


৯. জাতীয় নিরাপত্তা বিধান নিশ্চিত করা (Ensure national security) : National security বা জাতীয় নিরাপত্তা বিধান নিশ্চিত করার জন্যে Elite শ্রেণির রাজনৈতিক প্রক্রিয়ায় অংশগ্রহণ ঘটে থাকে। অনেক সময় একটি দুর্বল রাষ্ট্রকে পার্শ্ববর্তী শক্তিশালী রাষ্ট্র নানা অজুহাতে হুমকি প্রদান ও চাপ প্রয়োগ করে থাকে তাদের সিদ্ধান্ত মানার জন্য, যা জাতীয় স্বার্থের পরিপন্থী। যেমন- Elite শ্রেণি রাজনৈতিক কৌশল অবলম্বনের মাধ্যমে জাতীয় নিরাপত্তা জোরদার ও নিশ্চিত করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।


১০. ব্যক্তিগত ও রাষ্ট্রীয় অর্থনৈতিক উন্নয়ন (Individual and national economic development) : Elite শ্রেণির রাজনৈতিক প্রক্রিয়ার সাথে সম্পৃক্ত হওয়ার উদ্দেশ্য হিসেবে বলা যায়, ব্যক্তিগত ও রাষ্ট্রীয় অর্থনৈতিক অবস্থার উন্নয়ন ঘটানোর জন্য। যেমন- বিভিন্ন অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের যখন সম্পন্ন বা পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয় তা এলিটি শ্রেণির হাত দিয়েই হয়ে থাকে। তখন এলিট শ্রেণিরা প্রয়োজনের অতিরিক্ত অর্থ ধরে বিল করে থাকে। এতে অতিরিক্ত অথ নিম্ন পকেটে যায়। ফলে নিজের অর্থনৈতিক অবস্থার যেমন উন্নতি ঘটে, তেমনি রাষ্ট্রেরও উন্নয়ন ঘটে। তবে দুর্নীতির ব্যাপক সুযোগ ঘটে।


উপসংহার: আলোচনার পরিশেষে বলা যায় যে, রাজনীতি প্রাণবন্ত হয়ে উঠে জনগণের অংশগ্রহণের মাধ্যমে। তাই রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে জনগণের অংশগ্রহণের বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তবে রাজনৈতিক প্রক্রিয়ায় অংশগ্রহণের বিষয়টি ভাগে ভাগ করা হয়েছে। একটি সাধারণ জনগণের অংশগ্রহণ ও অন্যটি এলিট শ্রেণির অংশগ্রহণ। তাছাড়া উভয়েরই অংশগ্রহদের পিছনে ভিন্ন ভিন্ন উদ্দেশ্য রয়েছে, মূল উদ্দেশ্য হলো নিজেদের অবস্থার উন্নয়ন ঘটানো, তাতে কোন সন্দেহ নেই।


#buttons=(Ok, Go it!) #days=(20)

Our website uses cookies to enhance your experience. Check Now
Ok, Go it!