ধাতু যুগের বিস্তারিত বিবরণ দাও।

admin

ভূমিকা : আদিম যুগের মানুষের ব্যবহৃত জিনিসপত্র ও হাতিয়ারের ভিত্তিতে ১৮৩৬ সালে মানুষের অস্ত্র ব্যবহারের যুগকে তিনভাগে ভাগ করেছেন প্রস্তর যুগ, তাম্র ও ব্রোঞ্জ যুগ ও লৌহ যুগ, নব্য প্রস্তর যুগের শেষ দিকে এসে প্রস্তরের পাশাপাশি তাম্র ও ব্রোঞ্জের হাতিয়ার পাওয়া যায়। আরো পরে লোহার আবিষ্কার মানব ইতিহাসে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, ধাতুর যুগকে আবার তিনভাগে ভাগ করা হয়েছে। যথা- তাম্র, ব্রোঞ্জ ও লোহার যুগ।


ধাতু যুগের বিস্তারিত বিবরণ দাও।


ধাতু যুগের বিস্তারিত বিবরণ :

নিম্নে ধাতু যুগ সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা করা হলো :


১. তাম্র যুগ : প্রথমে মানুষ যে ধাতু ব্যবহার করতে শেখে তা হলো তামা, প্রাচীন বিশ্বে বিভিন্ন স্থানে বিক্ষিপ্তভাবে এ ধাতু পাওয়া যেত। অনেকের মতে, তামারও আগে প্রাচীন যুগে স্বর্ণ পাওয়া যেত। নব্য প্রস্তর যুগ থেকে ব্রোঞ্জ যুগে উত্তরণের মধ্যবর্তী সময় হলো তামা বা তাম্র যুগ। এ যুগের বিস্তারিত হলো-


(ক) সময়কাল ও বিস্ততি : তাম্র যুগের বিস্তৃতি ৫৫০০ খ্রিস্ট পূর্বাব্ধে। তবে কারো মতে ৬,০০০ কিংবা ৭,০০০ খ্রিস্ট পূর্বাব্দেও স্বর্ণ ও তামা পাওয়া যেত। নব্য প্রস্তর যুগে ফ্রান্সের বিভিন্ন ধ্বংসাবশেষের মধ্যে তামা ও স্বর্ণের তৈরি পুঁতি ও মালা পাওয়া যেত। প্রত্নতাত্ত্বিক খননকার্যের মাধ্যমে এর বিস্তৃতি সম্পর্কে জানা যায়। এ বিস্তৃতি ছিল ইরান, আনাতোলিয়া, নিকটপ্রাচ্য, বলকান, মিসর, ইরাক, ভারতবর্ষ প্রভৃতি স্থানে তাম্র যুগের নিদর্শন পাওয়া যায়।


(খ) জীবনযাত্রা : তাম্র যুগে মানুষ বিভিন্নভাবে তার নিদর্শন এঁকে যায়। এছাড়া এ যুগের প্রচুর তাম্র ও স্বর্ণের দ্রব্য এবং অলঙ্কার পাওয়া যায় । তাম্র যুগের বিভিন্ন শিল্পকর্ম বিশেষ করে স্থাপত্যকলা, মৃৎপাত্র, বুনন, বাস্কেট তৈরি, কৃষি কাজ ও মৎসশিকার দেখে বোঝা যায়, তাদের জীবন-যাত্রা কেমন ছিল। এ সময় গৃহের মধ্যেই কুমারের কারখানা, রান্নার স্থান, বাসস্থান, পৃথকভাবে নির্দিষ্ট থাকত। বসত বাড়ির দেয়াল মজবুত করতে তারা বুরুজ ব্যবহার করত।


(গ) ধর্মীয় বিশ্বাস : তাম্র যুগের মানুষ যে প্রজননে বিশ্বাস করত তা বোঝা যায় তাদের নির্মিত মূর্ত্তিকা মূর্তি দেখে, সে সময় ইরান, সাইপ্রাস, ব্যবিলনে গৃহে মৃতদেহ কবর দেওয়া হতো।


(ঘ) তাম্র ব্যবহার ঃ তামা ধাতু দিয়ে তারা অলংকারসহ নানা কাজে তা ব্যবহার করত। তামা গলাবার জন্য তারা চুল্লি, ধাতুর পাত্র, চিমটে ও ছাঁচের আবিষ্কার করে। ভারতীয় উপমহাদেশেও ধাতুর পান তামার ব্যবহার পাওয়া গেছে। এ দিয়ে প্রধানত তারা শিকারি অস্ত্র তৈরি করত । কারণ পাথরের চেয়ে তামা ছিল অত্যন্ত মসৃণ ও ধারালো।


২. বোঞ্জ যুগ : তামার যুগের কিছু পরেই বোঞ্জ ও পিতলের ব্যবহার শুরু হয়। অনুমান করা হয় ৪,০০০ খ্রিস্ট পূর্বাব্দের পর এবং খুব সম্ভবত ৩,৫০০ খ্রিস্ট পূর্বাব্দের আগে পশ্চিম এশিয়ায় প্রথম বোঞ্জ ব্যবহার শুরু হয়। তামা ও টিনের সংমিশ্রণে এটি একটি সংকর ধাতু। অন্যদিকে তামা ও দস্তার সংমিশ্রণে পিতল তৈরি হয়। উভয় মিশ্র ধাতু তামা অপেক্ষা কঠিন এবং কম উত্ততায় গলানো যায়।


(ক) বোঞ্জ যুগের বিস্তৃতি : প্রথম সিরিয়ায় ব্রোঞ্জের অস্তিত্ব পাওয়া যায়। ২২০০ খ্রিস্ট পূর্বাব্দে পূর্ব ইউরোপ ও ঈজিয়ান সাগর অঞ্চলে বোঞ্জের প্রচলন হয়। নতুন প্রস্তর যুগের শেষে তামা উৎপাদন শুরু হয়। এছাড়া ইরান আনাতোলিয়া, মিসর, মেসোপটেমিয়া, সুমেরীয়, ব্যবিলন, সিন্ধু সভ্যতায় ও বোজের সন্ধান পাওয়া যায়।


(খ) ব্রোঞ্জ আবিষ্কার : পরিকল্পিত উদ্ভাবকের পরিবর্তে ব্রোঞ্জ হঠাৎ আবিষ্কার হয়েছিল বলে অনেকে মনে করেন । খু সম্ভবত প্রচুর তামা বিশিষ্ট শিলার সাথে টিনও ছিল। কোনো কোনো লোক সেই শিলার সাহায্যে চুল্লি তৈরি করেছিল। পরে তামা ও টিন গলে স্থানচ্যুত ও গলিত অবস্থায় প্রবাহিত হয়। যা মাটির কোনো নিচু স্থানে তা মিশ্র হিসেবে সি হয়েছিল। ঠাণ্ডা হবার পর যে ধাতু উৎপন্ন হয় তার কঠিন্য ও দুর্ভেদ্যতা, স্থায়িত্ব মানুষকে অভিভূত করে। এভাবে আগুনে পুঁড়িয়ে শিলা থেকে তামা ও টিন এর মিশ্রিত রূপে ব্রোঞ্জ পাওয়া যায়।


(ঘ) বোঞ্জ যুগের জীবনযাত্রা ঃ এ যুগে প্রাপ্ত মৃৎপাত্র, হাতিয়ার, যন্ত্রপাতি, স্থাপত্য, ভাস্কর্য নিদর্শন থেকে সহজেই উপলব্ধি করা যায় তাদের জীবনযাত্রা কেমন ছিল। আনাতোলিয়ার মানুষের জীবনযাত্রা সাদাসিদে ছিল। তারা পাঘরের ভেতরের মাটি দিয়ে গৃহ নির্মাণ করতো, কাঠ দিয়ে বর্গাকৃতির ছাদ তৈরি করতো। তাদের গৃহপালিত পশুর মধ্যে ছিল গরু, ভেরা, ছাগল, ঘোড়া প্রভৃতি। এক পাল কুকুরও নানান জীবজন্তু তদারক করত। তারা কৃষি কাজে ব্যবহার করত কাঠের লাঙ্গল। প্রদীপ জ্বালাতো এবং মৃত ব্যক্তির সৎকার করতো।


৩. লৌহ যুগ ঃ মানব সভ্যতা বিকাশের সর্বোচ্চ স্তর হলো লৌহ যুগ। মিসর ছাড়া আফ্রিকার সর্বত্র মানুষ প্রস্তর যুগ হতে সরাসরি লৌহ যুগে প্রবেশ করে। লোহার পুরনো ধ্বংসাবশেষের নমুনা ইউরোপ ও মিসরেও আবিষ্কৃত হয়েছে। ল্যা পিস লাজুমি বা লাজবর্ধ মনির সঙ্গে লোহার পুঁতি গেঁথে তৈরি একটি গলার হার পাওয়া যায়। চতুর্থ রাজবংশের রাজত্বকালে নির্মিত পিরামিডের অভ্যন্তরে কতকগুলো লোহ নির্মিত যন্ত্রপাতি আবিষ্কৃত হয়েছে। তবে লোহা নিষ্কাশন ও শিল্পের সূচনা হয় এশিয়ার মাইনরে। হিট্রাইটকে লোহা সংস্কৃতির আদি উৎপত্তিস্থান বলা হয়। হিট্রাইব থেকে লোহা পরবর্তীতে ভূমধ্যসাগরীয় এলাকা, নিকট প্রাচ্য পরে ইউরোপে প্রচলিত হয়। খ্রিস্ট পূর্ব ১২৫০ অব্দে মিসরের ফারাও রাজা হিট্রাইটের রাজার কাছে লোহা সরবরাহের অনুরোধ জানায়। তাতে হিট্রাইট রাজা শর্ত হিসেবে স্বর্ণ চেয়ে পত্র পাঠান। সেই পত্রালাপের মূল চিঠি উদ্ধার করা সম্ভব হয়েছে। এছাড়াও ইউরোপের দানিয়ুব, ক্রীট দ্বীপ, গ্রিস, ঈজিয়ান, ফিনিশীয়, রোমান, চীন সভ্যতায় লোহার ব্যবহারের নিদর্শন পাওয়া যায়।


উপসংহার ঃ পরিশেষে বলা যায় যে, ধাতুর যুগ ছিল মানব সভ্যতার একটি উল্লেখযোগ্য গুরুত্বপূর্ণ যুগ। ধাতুর উদ্ভব ও বিস্তার উৎপাদনে সহায়ক ছিল। এ সময় সভ্যতায় মানুষ ধাতু নির্মিত কৃষিজ কাজের হাতিয়ারসহ যাবতীয় হাতিয়ার তৈরি করত তামা, ব্রোঞ্জ ও লোহা দ্বারা। ফলে এগুলো যেমন ছিল মসৃণ ও ধারালোও অনেক বেশি স্থায়ী।


#buttons=(Ok, Go it!) #days=(20)

Our website uses cookies to enhance your experience. Check Now
Ok, Go it!