বিশ্বসভ্যতায় ব্যবিলনীয়দের অবদান আলোচনা কর।

admin


ভূমিকাঃ

ব্যাবিলনীয় সভ্যতাকে প্রথম সভ্যতা হিসেবে বিবেচনা করা হয়। টাইগ্রিস ও ইউফ্রেটিস নদীর মধ্যবর্তী নবপলীয় যুগে মেসোপটেমিয়া নামক স্থানে ব্যাবিলনীয় সভ্যতা গড়ে উঠেছিল। খ্রিস্টপূর্ব ২০০০-১৫০০ অব্দে এ সভ্যতার ব্যাপক অগ্রগতি সাধিত হয়।


বিশ্বসভ্যতায় ব্যবিলনীয়দের অবদান আলোচনা কর।


বিশ্বসভ্যতায় ব্যবিলনীয়দের অবদান :

নদীতীরবর্তী সভ্যতাগুলোর মধ্যে ব্যাবিলনীয় সভ্যতা অন্যতম। নিম্নে ব্যাবিলনীয় সভ্যতার অবদানগুলো তুলে ধরা হলো-


১. আইন প্রণয়ন : সম্রাট হাম্বুরাবির রাজত্বকালের শেষ দিকে নির্দেশিত বিধানমালা প্রস্তরখণ্ডে খোদাই করে রাখা হয়। পরবর্তীতে তা হাম্বুরাবি আইন নামে পরিচিতি লাভ করে। হাম্বুরাবিই ছিলেন প্রথম ব্যক্তি যিনি একটি সুষ্ঠ মানবাধিকারসম্পন্ন বৈষম্যহীন সত্যনিষ্ঠার উপর আইনকে প্রতিষ্ঠিত করেন। তিনি ব্যবসায়-বাণিজ্য, বিবাহ, পরিবার, সম্পত্তি, বৃত্তিধারী লোকদের পারিশ্রমিক ও দায়িত্ব, ভাড়ার হার এবং পরিমাণ ও ক্রয়-বিক্রয় সংক্রান্ত প্রভৃতি ক্ষেত্রে তিনি বিধি-নিষেধ আইন উল্লেখ করেন।


২. সরকার পদ্ধতি : ব্যাবিলনীয় সভ্যতার অন্যতম পৃষ্ঠপোষক হাম্বুরাবি মেসোপটেমিয়ার রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্য এক শক্তিশালী সরকার ব্যবস্থা গড়ে তোলেন। আর সেখানে আদর্শবাদী সম্রাট হিসেবে হাম্বুরাবিকে বিবেচনা করা হয়। হাম্বুরাবি সমাজে শান্তি-শৃঙ্খলা বজায় রাখা, সুষ্ঠুভাবে সামাজিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করা, নতুন ভেদাভেদ দূর করে সত্য সুন্দর সভ্যতা প্রতিষ্ঠা করা ইত্যাদি ক্ষেত্রে গুরুত্বআরোপ করেন।


৩. লিখন পদ্ধতি : প্রাচীন মিশরে প্রচলিত ও সুমেরীয়দের ব্যবহৃত চিত্রলিপি অপেক্ষা উন্নতর এক লিপি হচ্ছে প্রাচীন ব্যাবিলনীয়দের প্রবর্তিত “কিউনিফর্ম লিপি” । মাটির থালার আকৃতি অবয়বে তিনকোণা কাঠির সাহায্যে এ লিপিতে মনের ভাব ফুঠিয়ে তুলে তা রোদে অথবা আগুনে পুড়িয়ে স্থায়ী করা হয়। কিউনিফর্ম লিপিতে অন্যান্য ৫০০ অক্ষর স্থান পেয়েছে। এ লিপি পশ্চিম এশিয়া মহাদেশে খ্রিস্টপূর্ব ৩০০০ অব্দ হতে পরবর্তী খ্রিস্টীয় শতাব্দী পর্যন্ত অবলীলায় চালু ছিল। কবিরা এ উপাখ্যান নিজেদের সৃষ্ট সাহিত্য রসে আরো আকর্ষণীয় ও হৃদয়গ্রাহী করে তোলে। সাহিত্য কর্মে ব্যাবিলনীয় কবিরা ভাষায় গদ্যরীতি ও পদ্যরীতিতে সাহিত্যকর্ম সম্পাদন করেছেন। তাদের লেখনীতে পৌরাণিক কাহিনী অপূর্ব সাহিত্য রসে সুসমৃদ্ধ হয়ে উঠে।


৩. চিত্র ও অঙ্কনবিদ্যায় অবদান : নিত্য ব্যবহার্য মৃৎপাত্র ও প্রস্তর নির্মিত পাত্রের গায়ে নানা প্রকার অলংকার একে কারুশিল্পের দক্ষতা দেখিয়েছে। অশরীরি প্রেতাত্মার ভয়-ভীতি হতে দূরে থাকতে কোনো কিছু হতে রক্ষা পাবার আশায় তারা কবচ ব্যবহার করত। সে সব কবচ, অলংকার মোহর ইত্যাদিতেও তারা শৈল্পিক প্রতিভার স্বাক্ষর রেখেছে।


৫. জ্যোতিষশাস্ত্রে অবদান : জ্যোতিষশাস্ত্রের ক্ষেত্রে ব্যাবিলনীয়রা ব্যাপক অবদান রাখে। ব্যাবিলনীয়রা সূর্য ঘড়ি, জলঘড়ি এসবের ব্যবহার চালু করে। তারা মাস, বছর, দিন ইত্যাদির ক্ষেত্রে সময় নিরূপণ ও বণ্টনের প্রথা চালু রেখে চন্দ্র গ্রহণ, সূর্য গ্রহণ ইত্যাদি বিষয়ে তারা সঠিক ধারণা দিতে পেরেছিল।


৬. ব্যাবিলনীয় সমাজব্যবস্থা : বিশ্ব সভ্যতায় ব্যাবিলনীয়দের সমাজব্যবস্থা ছিল অভিনব এক নতুন সংযোজন ব্যাবিলনীয় সমাজব্যবস্থা তিন শ্রেণিতে বিভক্ত ছিল উচ্চশ্রেণি, মধ্যম শ্রেণি ও নিম্নশ্রেণি। উচ্চশ্রেণির মধ্যে ছিল রাজা পণ্ডিত পুরোহিত এবং সৈন্যরা এ শ্রেণির অন্তর্ভুক্ত ছিল। আর মধ্যম শ্রেণির মধ্যে বড় বড় শিল্পপতি ও স্বাধীন ব্যবসায়ীগণ এবং কৃষক, সাধারণ শ্রমিক এবং যুদ্ধবন্দি তথা দাসদাসীগণ এ শ্রেণির অন্তর্ভুক্ত ছিল।


৭. ব্যবসা-বাণিজ্যে অবদান : ব্যবসায়-বাণিজ্যে প্রাচীন ব্যাবিলনীয়রা স্বচ্ছতার পরিচয় বহন করতো। সরকারের নির্দেশ মোতাবেক তারা ব্যবসায়-বাণিজ্যের ক্ষেত্রে কোনো প্রকার অসাধুতা এবং অত্যধিক মুনাফা অর্জন করত না। বর্তমান যুগের মতো তারা ত্রুটিযুক্ত হিসাব পদ্ধতির প্রচলনে এগিয়ে আসে। সরকারের নিয়ন্ত্রণে ছিল সকল প্রকার ব্যবসা-বাণিজ্য, শিল্প, ব্যাংক ইত্যাদি।


৮. সাহিত্য ও শিক্ষাব্যবস্থা : প্রাচীন ব্যাবলিনীয় শিক্ষা ও সাহিত্যে বেশ এগিয়ে গিয়েছিল। ব্যাবিলনীয়রা সুমেরীয়দের অমর সাহিত্য গিলগামেশ উপাখ্যান অধ্যায়ন করে।


৯. ঘণ্টা ও ঘড়ির আবিষ্কার : বর্ষপঞ্জিকা প্রণয়ন ও ব্যাবিলনীয়রা সর্বপ্রথম বর্ষপঞ্জিকা প্রণয়নের কৃতিত্ব দাবি করতে পারে। তারা বছরকে ৩৬৫ দিনে এবং একটি বছরকে চন্দ্রমাসের হিসেবে বিভক্ত করে তারা একটি পঞ্জিকা  প্রনয়ন করেন। ব্যাবিলনীয়রা দিনকে ঘণ্টায় বিভক্ত করে ঘণ্টাধ্বনির উদ্ভাবন করেন।


১০. গণিতে অবদান : গণিত শাস্ত্রে ব্যাবিলনীয়রা বিভিন্ন প্রক্রিয়া উদ্ভাবন করেন। তারা গুণ, ভাগের নামতা বীজগণিতের সরল সমীকরণ করা, বৃত্তকে ৩৬৫ ডিগ্রিতে ভাগ করে গণিতশাস্ত্রে ব্যবহার করা, দশমিকের ব্যবহার ব্যাবিলনীয়রাই সর্বপ্রথম করেন। তারাই প্রথম শূন্যের ধারণা দেন।


১১. স্থাপত্য বিদ্যা : ব্যাবিলনীয়রা স্থাপত্যশিল্প নৈপুণ্য প্রদর্শন করতে সক্ষম হন। ব্যাবিলনীয় ধর্মমন্দির বা জিলগুরাট সুমেরীয় শিল্পীদের অনুকরণে নির্মিত ছিল। সাতটি ধাপে নির্মিত ধর্মমন্দির সৌরমন্ডলের সাতটি গ্রহ ও উপগ্রহের নামে নামকরণ করা হয়।


১১. চিকিৎসাবিজ্ঞানে অবদান : ব্যাবিলনীয়রা চিকিৎসা-বিজ্ঞান চর্চায় এগিয়ে আসে। ব্যাবিলনীয়রা দাঁতের ব্যাথা নিরাময়ে সূর্যমুখী ফুলের বীজ ব্যবহার করত। পেটের পীড়ায় ব্যবহার করতো দুধ। কেশহীন মাথায় তেলের স্যাম্পু আর মদ ব্যবহার করত।


উপসংহার : পরিশেষে বলা যায় যে, আইন, লিপি, সরকার ব্যবস্থায়, ব্যবসা-বাণিজ্য, চিকিৎসাবিদ্যা প্রভৃতির ক্ষেত্রে ব্যাবিলনীয়রা ব্যাপক অবদান রেখেছে। পরবর্তীতে তা নানা বিবর্তনবাদ ও ব্যপ্তিবাদের মাধ্যমে আমাদের দৈনন্দিন জীবনে প্রবেশ করে।


#buttons=(Ok, Go it!) #days=(20)

Our website uses cookies to enhance your experience. Check Now
Ok, Go it!