রুশোর সম্পত্তির উদ্ভব ও সামাজিক বৈষম্য সম্পর্কিত ধারণা ব্যাখ্যা কর।

admin

ভূমিকা :

আধুনিক রাষ্ট্রচিন্তায় যেসব মনীষীর অবদান চিরস্মরণীয় তাদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন জ্যা জ্যাক রুশো। যিনি ফরাসি বিপ্লবের মহান দার্শনিক সাম্য, মৈত্রী ও স্বাধীনতার অমোঘবাণীর প্রবক্তা ও ইউরোপীয় পথপ্রদর্শক। রুশো তাঁর যুক্তিপূর্ণ ও সুচিন্তিত মতবাদকে The Social contrcat" নামক গ্রন্থে আবদ্ধ করেছেন এবং উক্ত গ্রন্থকে মহান ফরাসি বিপ্লবের বাইবেল হিসেবে আখ্যায়িত করেন। তাঁর "The social contract" গ্রন্থে তিনি রাষ্ট্র ও ব্যক্তি জীবনের বিভিন্ন দিক অতি গুরুত্ব সহকারে আলোচনা করেছেন। রাষ্ট্রদর্শনের ক্ষেত্রে তাঁর এ মতবাদ একটি গুরুত্বপূর্ণ অবদান। উক্ত বিষয়সমূহ বিশ্লেষণ করতে গিয়ে রুশো ব্যক্তিগত সম্পত্তি ও সামাজিক বৈষম্য সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা করেছেন ।



ব্যক্তিগত সম্পত্তির উদ্ভব সম্পর্কে রুশোর ধারণা :

যেসব মতবাদের কারণে রুশো রাষ্ট্রচিন্তার মৌলিকত্বের দাবি রাখতে সক্ষম হয়েছেন তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য মতবাদ হলো ব্যক্তিগত সম্পত্তি সম্পর্কিত ধারণা। ব্যক্তিগত সম্পত্তির উদ্ভব সম্পর্কে রুশো যদিও ব্যাপকভাবে আলোচনা করেননি তবুও তিনি যে তত্ত্ব উপস্থাপন করেছেন নিঃসন্দেহে তা যুগান্তকারী। নিম্নে রুশোর সম্পত্তি সম্পর্কিত ধারণাটি আলোচনা করা হলো :


১. রাষ্ট্রের উৎপত্তি : রুশোর সম্পত্তির উদ্ভব সম্পর্কে ধারণা প্রদানের পূর্বে রাষ্ট্রের উৎপত্তি সম্বন্ধে আলোচনা করার প্রয়োজন রয়েছে। কেননা রাষ্ট্রের উৎপত্তি ও সম্পত্তির উদ্ভব ধারণা পরস্পরের সাথে নিবিড়ভাবে সম্পর্কযুক্ত। রুশোর মতে রাষ্ট্রপূর্ব অবস্থায় মানুষ প্রকৃতির রাজ্যে বসবাস করতো এবং তখন মানুষের মধ্যে সম্পত্তির ধারণা ছিল না। কিন্তু প্রকৃতির রাজ্যের সঙ্গত কারণে মানুষ সামাজিক যুক্তির দ্বারা রাষ্ট্র গঠন করে। রাষ্ট্র গঠিত হওয়ার পরবর্তী পর্যায়ে মানুষের মধ্যে সম্পত্তির ধারণা বিকাশ লাভ করতে থাকে ।


২. ব্যক্তির মালিকানা : সমাজ রাষ্ট্র তথা রাজা সম্পত্তির মালিকানার অধিকারী হওয়ার ফলে ব্যক্তিকে সম্পত্তির অধিকার প্রদান করে। সম্পত্তি হতে ব্যক্তিকে না করে সম্পত্তির ওপর ব্যক্তির দখলদারীত্ব প্রতিষ্ঠা করে দেয়। পরবর্তীতে দখলদারীগণ সাধারণের সম্পত্তির অধিকারী হয়ে ওঠে বা রাজশক্তি নির্ধারিত সম্পদের মালিকে পরিণত হয়।


৩. শাসকের অধিকার : সম্পত্তি নিয়ে দ্বন্দ্বের ফলশ্রুতিতে ব্যক্তিগত সম্পত্তির ওপর সাধারণের অধিকারভুক্ত হয় এবং পরবর্তীতে তা রাজা বা শাসকের অধিকারে চলে যায়। ফলে জমির মালিক শাসকের অধীনে আবদ্ধ হয়। এভাবে রাষ্ট্রীয় ভাবে শাসক বা রাজা সম্পত্তির মালিকানার অধিকার হওয়ায় দেশবাসী তার বাধ্যগত অনুগতে পরিণত হয়।


৪. সম্পত্তির অধিকার : রুশোর মতে, সম্পত্তির ওপর প্রত্যেক ব্যক্তির অধিকার রয়েছে। রাজশক্তি কর্তৃক নির্ধারিত ভাগ-বাটোয়ারার মাধ্যমে প্রাপ্ত বা জোর করে দখলকৃত সম্পত্তির ওপর মানুষ অধিকার প্রতিষ্ঠা করে। রুশোর মতে, যে উপায়েই এই সম্পত্তি অর্জিত হোক না কেন প্রত্যেক ব্যক্তির নিজের সম্পত্তির ওপর অধিকার আছে।


৫. রাষ্ট্রীয় মালিকানা : রুশোর মতানুসারে, সামাজিক চুক্তির দ্বারা রাষ্ট্র ব্যবস্থা গঠিত ও পরিচালিত হওয়ার সাথে সাথে রাষ্ট্র সমস্ত সম্পত্তির মালিকে পরিণত হয়। অর্থাৎ চুক্তির দ্বারা সম্পত্তির ওপর রাষ্ট্রীয় মালিকানা প্রতিষ্ঠিত হয়। রুশোর মতে, “রাষ্ট্রের ভেতরে এ চুক্তিই হলো সকল প্রকার বিষয়-সম্পত্তি অধিকারের ভিত্তিস্বরূপ"।


৬. সম্পত্তি ও ঞ্চ : রুশোর মতে, যুদ্ধ বা মানুষের মধ্যে কলহপ্রিয়তা সমাজ স্থাপনের পর জন্ম নিয়েছে। রুশো মনে করেন, মানুষের হাতে যখন ক্ষমতা ও সম্পত্তি পুঞ্জীভূত হলো ও মস্তিষ্কে যুক্তিবাদিতা আশ্রয় নিল তখন থেকেই সে প্রতিবেশীর সাথে দ্বন্দ্বে লিপ্ত হতে শিখল ও স্বার্থান্বেষণে ছুটতে আরম্ভ করলো। নিজের সম্পত্তি বৃদ্ধি ও সংরক্ষণের উদ্দেশ্যে মানুষ অন্যের সম্পত্তিতে হস্তক্ষেপ করতে আরম্ভ করলো। রুশোর মতে, “ব্যক্তিগত সম্পত্তির ধারণা হতেই সমাজে দ্বন্দ্বের সূত্রপাত ঘটে।”


৭. সমাজের হাতে সম্পত্তি হস্তান্তর : প্রকৃতির রাজ্যের হাত থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য মানুষকে জোটবদ্ধ হতে হয়। ফলে সকল মানুষ জোটবদ্ধ হয়ে তারা নিজেকে এবং নিজেদের একত্রীভূত করে সমাজ গঠন করে। সামর্থ্য বলতে রুশো এখানে বিষয় সম্পত্তির কথা বলেছেন। রুশো বলেছেন- “মানুষের নিজস্ব সকল বিষয় সম্পত্তি সামর্থ্যের এক অংশ” বিষয় সম্পত্তি হস্তান্তরের ফলে শাসক বা রাজার পরিবর্তে সমাজ সম্পত্তির অধিকারী হয়ে ওঠে ।


রুশো সামাজিক বৈষম্য সম্পর্কে রুশোর ধারণা সম্পদের বা সম্পত্তির উদ্ভব সম্পর্কে আলোচনার সাথে সাথে সামাজিক বৈষম্য নিয়েও ব্যাখ্যা, বিশ্লেষণ করেছেন নিম্নে তা আলোচনা করা হলো :


১. সমাজের উৎপত্তি : রুশোর মতে, রাষ্ট্রীয় সংগঠন সৃষ্টি হওয়ার পূর্বে মানুষ প্রকৃতি রাজ্যে বাস করতো। প্রকৃতির রাজ্যে বিশৃঙ্খল পরিস্থিতি থেকে আত্মরক্ষার পথে যে সমস্ত বাধা ছিল তাদের শক্তি এতো বেশি যে, ব্যক্তি এককভাবে সেই শক্তিকে বাধা দিতে পারছিল না। অথচ বাধা না দিলে তাদের ধ্বংস অনিবার্য। এই পরিস্থিতিতে তাদের সামনে একটি মাত্র পথ খোলা ছিল আর তা হলো নিজেদেরকে এক জায়গায় জোটবদ্ধ করা। অন্য কোনো উপায় না দেখে প্রকৃতির রাজ্যের মানুষ জোটবদ্ধ হয়ে বিদ্যমান শক্তির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিয়ে সমাজ গঠন করে।


২. মানুষের সমাজ : মানুষের সমাজ কীরূপ হবে রুশো সে সম্পর্কে আলোচনা করেছেন। তাঁর মতে, জাতি প্রকৃত খ্রিস্টান ধর্মাবলম্বী হলে তাদের প্রতিষ্ঠিত সমাজ আমরা যতোখানি একত্রিত অবস্থায় কল্পনা করতে পারি মানুষের সমাজও ঠিক ততোখানি হবে ।


৩. সমাজের ঐক্য : রুশো সামাজিক বৈষম্য বলতে বুঝিয়েছেন তাকে যা সমাজকে অচল করে দেয় বা সমাজে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করে বা সমাজের প্রচলিত রীতিনীতির ক্ষেত্রে বাধা সৃষ্টি করে । তিনি আরো বলেন, সমাজ থেকে সামাজিক বৈষম্য দূর করতে হলে এর অন্তর্ভুক্ত মানুষের মধ্যে ঐক্য স্থাপন করতে হবে।


৪. সামাজিক ধর্ম : রুশো বিশ্বাস করতেন, সমাজের নীতি- নির্ধারণকরা অশিক্ষিত জনগণের সামনে যেসব সুপারিশ পেশ করবেন সেগুলো তারা জনগণের ভাষায় পেশ না করে তাদের নিজস্ব ভাষায় পেশ করবেন। অর্থাৎ জনসাধারণের অভিরুচির পরিবর্তে নিজের ইচ্ছার বাস্তবায়ন ঘটাবেন।


৫. সমাজের সাথে ধর্মের সম্পর্ক : রুশো বলেছেন, প্রত্যেক সমাজ ব্যবস্থায় দুটি ধর্ম থাকবে। যার একটি মানবধর্ম এবং অন্যটি নাগরিক ধর্ম। মানব ধর্ম বলতে রুশো বুঝিয়েছেন যে, এখানে কোনো ধর্ম প্রতিষ্ঠান বা ঈশ্বরের অস্তিত্ব থাকবে না। বরং আধ্যাত্মিক জ্ঞান চর্চা ও শাশ্বত ন্যায় ব্যবস্থা থাকবে। অর্থাৎ সকল ক্ষেত্রে মানবতার প্রাধান্য নিশ্চিত করবে।


৬. সামাজিক অসহিষ্ণুতা : রুশোর মতে, সামাজিক অসহিষ্ণুতা ও ধর্মমতের অসহিষ্ণুতার মধ্যে পার্থক্য সৃষ্টি না করে সমাজ হতে তা দূর করতে হবে। তা না হলে সামাজিক বৈষম্য দূর করা অসম্ভব।


উপসংহার:

পরিশেষে বলা যায় যে, সম্পত্তির উদ্ভব ও সামাজিক বৈষম্য সম্পর্কে রুশো যে বক্তব্য প্রদান করেছেন তা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এর মাধ্যমে রুশো রাষ্ট্রীয় জীবনে সম্পদের সুষ্ঠু বণ্টন ও সমাজের অনাচার প্রতিরোধে দৃঢ় পদক্ষেপ গ্রহণ করেছেন। রুশো তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ "The Social Contract" এ তিনি রাষ্ট্র ও ব্যক্তি জীবনের নানাদিক খুব গুরুত্বের সাথে আলোচনা করেছেন। রুশো তাঁর অন্যান্য মতবাদের মতো ব্যক্তিগত সম্পত্তির উদ্ভব ও সামাজিক বৈষম্য মনোভাবটিও তিনি যত্নসহাকারে আলোচনা করেছেন। সুতরাং বলা যায়, রাষ্ট্রীয় জীবনে সম্পদের সুষ্ঠু বণ্টন ও সমাজের অনাচার প্রতিরোধের জন্য দৃঢ় পদক্ষেপ গ্রহণ করেছেন। তাই রাষ্ট্র সম্পর্কে রুশোর এই মতবাদটি একটি গুরুত্বপূর্ণ ধারণা বা তত্ত্ব।


#buttons=(Ok, Go it!) #days=(20)

Our website uses cookies to enhance your experience. Check Now
Ok, Go it!